Table of Contents5
ডাচ-বাংলা ব্যাংকের ভিসা কার্ড থেকে ৫,০০০ টাকা কেটে নিয়েও বিকাশ অ্যাকাউন্টে একটি পয়সাও যোগ হয়নি। বিকাশ বলছে ব্যাংকে যান, ব্যাংক বলছে ৬০ কার্যদিবস অপেক্ষা করুন — এই দায় এড়ানোর চক্রে পিষ্ট হচ্ছেন একজন সাধারণ গ্রাহক।
নিজস্ব প্রতিবেদক | অভিযোগ: মোঃ আবু সুফিয়ান
ঘটনার শুরু
ডিজিটাল লেনদেন আমাদের জীবনকে সহজ করেছে — এটা সত্য। কিন্তু এই সহজ ব্যবস্থার আড়ালে যখন প্রযুক্তিগত ত্রুটি ঘটে, তখন ভোগান্তির শিকার হন সাধারণ মানুষ। মোঃ আবুসুফিয়ান তেমনই একজন।
গত ২৩ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার রাতে তিনি তার বিকাশ অ্যাপ থেকে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের ভিসা কার্ড ব্যবহার করে ৫,০০০ টাকা অ্যাড মানি করার চেষ্টা করেন। লেনদেন সম্পন্নের নিশ্চিতকরণ বার্তা আসার আগেই কার্ড থেকে পুরো টাকা কেটে যায় — কিন্তু বিকাশ অ্যাকাউন্টের ব্যালেন্সে কোনো পরিবর্তন হয়নি।
টেকনিক্যাল ভাষায় এটিকে বলা হয় “Failed Transaction with Debit” — লেনদেন ব্যর্থ হয়েছে, কিন্তু টাকা আগেই কার্ড থেকে কেটে গেছে। সাধারণত এই ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে টাকা ফেরত আসার কথা। কিন্তু আবুসুফিয়ানের ক্ষেত্রে তা আর হয়নি।
বিকাশ ও ব্যাংকের মধ্যে দায় এড়ানোর খেলা
প্রথম পদক্ষেপ — বিকাশ হেল্পলাইন (16247)
ঘটনার পরপরই আবুসুফিয়ান বিকাশের গ্রাহকসেবা হেল্পলাইনে কল করেন। উত্তর আসে — “৭ কার্যদিবস অপেক্ষা করুন, সমাধান না হলে ব্যাংকে যোগাযোগ করুন।” তিনি ব্যাংকে গেলেন।
দ্বিতীয় পদক্ষেপ — ডাচ-বাংলা ব্যাংক
ব্যাংক প্রথমে বলল ২ কার্যদিবস অপেক্ষা করতে। সেই সময় পেরোলে ব্যাংক ভিসা কার্ডের বিভিন্ন নীতিমালা উদ্ধৃত করে জানাল — সমস্যা সমাধানে সর্বোচ্চ ৬০ কার্যদিবস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
একজন সাধারণ মানুষের কাছে ৬০ কার্যদিবস মানে প্রায় তিন মাস। তিন মাস নিজের ৫,০০০ টাকা আটকে রেখে শুধু “অপেক্ষা করুন” শুনতে হবে — এটা কোন ধরনের গ্রাহক সেবা?
তৃতীয় পদক্ষেপ — আবার বিকাশে ফিরে
৭ কার্যদিবস পেরিয়ে যাওয়ার পরও টাকা না ফেরায় আবুসুফিয়ান আবার বিকাশে কল করেন। এবার নতুন যুক্তি হাজির — সরকারি ছুটির দিনগুলো ৭ কার্যদিবসের হিসাবে গণনা হয় না। অর্থাৎ, অপেক্ষার মেয়াদ আরও বাড়ল।
হতাশ হয়ে একটু জোরালো ভাষায় কথা বলতেই কর্মকর্তা সরাসরি কল কেটে দিলেন।
দ্বিতীয়বার কল করলে অন্য কর্মকর্তা আগের ঘটনাই অস্বীকার করলেন। বললেন, “বিকাশ কখনো গ্রাহকের কল কাটে না।” কল রেকর্ডের কথা উল্লেখ করতেই বলা হলো, “আপনি হয়তো অসম্মানজনক ভাষা ব্যবহার করেছিলেন, তাই কল কাটা হয়েছে।” এই কর্মকর্তাও শেষ পর্যন্ত ব্যাংকে যেতে বলে কল শেষ করলেন।
“পাঁচ হাজার টাকা ইনকাম করতে সময় লাগে, আর আপনারা কয়েক সেকেন্ডে আমার টাকা মেরে দিলেন। বিকাশের কাছে গেলে, বলে “ব্যাংকে জান” ব্যাংকের কাছে গেলে, বলে “বিকাশের কাছে যান” এটা কি আমার সাথে ফাজলামো শুরু করছেন” — মোঃ আবু সুফিয়ান, ভুক্তভোগী
সমস্যার উপরে সমস্যা — কাস্টমার সার্ভিসের জন্যও গেল টাকা
আবুসুফিয়ানের অভিযোগের সবচেয়ে কষ্টের দিক হলো — নিজের হারানো টাকার কথা জানাতে গিয়েও তাকে আরও টাকা খরচ করতে হচ্ছে। একাধিকবার হেল্পলাইনে কল করতে গিয়ে তার ২০০ টাকারও বেশি ফোনবিল চলে গেছে।
তিনি যৌক্তিক প্রশ্নটি তুললেন — যে কাস্টমার সার্ভিসে কথা বলতেই নিজের পকেট থেকে টাকা দিতে হয়, অথচ কোনো সমাধান মেলে না, সেই সার্ভিস রাখার অর্থ কী?
ভুক্তভোগীর আর্থিক ক্ষতির সংক্ষিপ্ত চিত্র:
| ক্ষতির ধরন | পরিমাণ |
|---|---|
| আটকে পড়া অ্যাড মানি | ৫,০০০ টাকা |
| হেল্পলাইনে ফোন খরচ | ২০০+ টাকা |
| মানসিক ভোগান্তি | অমূল্য |
এই পরিস্থিতিতে আপনার করণীয়
যদি আপনিও কখনো বিকাশে অ্যাড মানি করার পর কার্ড থেকে টাকা গেলেও বিকাশে না ঢোকার সমস্যায় পড়েন, তাহলে নিচের পদক্ষেপগুলো নিন:
- লেনদেনের SMS ও অ্যাপের ইতিহাস সংরক্ষণ করুন — তারিখ, সময় ও পরিমাণসহ।
- বিকাশ হেল্পলাইন (16247) ও ব্যাংকের হেল্পলাইনে কলের তারিখ ও কথোপকথন নোট রাখুন।
- লিখিত অভিযোগ (ই-মেইল বা ফর্মে) করুন — মৌখিক অভিযোগের চেয়ে লিখিত অভিযোগ বেশি কার্যকর।
- বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট বিভাগে অভিযোগ করতে পারেন: https://www.bb.org.bd
- ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অভিযোগ করুন — কাগজপত্র সঙ্গে নিন।
- সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ্য অভিযোগ করুন — অনেক সময় ব্র্যান্ড দ্রুত সাড়া দেয়।
বিকাশ ও ব্যাংকের নীরবতা — এটাও একটা বার্তা
এই প্রতিবেদন তৈরির সময় পর্যন্ত বিকাশ বা ডাচ-বাংলা ব্যাংক কোনো পক্ষ থেকেই এই নির্দিষ্ট অভিযোগ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। উভয় প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে — কোনো মন্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদন আপডেট করা হবে।
তবে এই নীরবতাটাও একটি বার্তা দেয়। যখন দুটি বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান একজন সাধারণ গ্রাহকের স্পষ্ট অভিযোগের বিষয়ে কিছু বলতে পারে না বা বলতে চায় না — তখন বোঝা যায়, গ্রাহক সুরক্ষার কাঠামো কতটা দুর্বল।
মোবাইল ব্যাংকিং ও প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের সংযোগস্থলে যে শূন্যতা রয়েছে, সেটিই আবুসুফিয়ানের ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দুটি প্রতিষ্ঠান পরস্পরের দিকে দায় ঠেলতে থাকলে মাঝখানে চাপা পড়েন সাধারণ মানুষ।
“যদি কাস্টমার সার্ভিস থাকার পরেও কোনো সেবা না পাই, তাহলে এই কাস্টমার সার্ভিস রাখার উদ্দেশ্য কী?” — মোঃ আবু সুফিয়ান
আবুসুফিয়ানের গল্প শুধু একজন মানুষের ৫,০০০ টাকা হারানোর গল্প নয়। এটি একটি ব্যবস্থার ব্যর্থতার গল্প — যেখানে প্রযুক্তি আছে, কিন্তু জবাবদিহিতা নেই; সার্ভিস আছে, কিন্তু সমাধান নেই।
বিকাশ ও ডাচ-বাংলা ব্যাংক উভয়েরই উচিত এই ধরনের “Failed Transaction with Debit” সমস্যার জন্য একটি স্পষ্ট, দ্রুত এবং স্বচ্ছ সমাধান প্রক্রিয়া তৈরি করা — যেখানে গ্রাহককে দুই প্রতিষ্ঠানের মাঝে ঘুরতে হবে না।
আপনিও কি এই ধরনের বিকাশে অ্যাড মানি সমস্যার শিকার হয়েছেন? নিচে কমেন্টে আপনার অভিজ্ঞতা জানান — হয়তো আপনার গল্পই পরবর্তী কাউকে সাহায্য করতে পারবে।
📌 বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই প্রতিবেদনটি ভুক্তভোগীর বর্ণনার ভিত্তিতে তৈরি। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদন আপডেট করা হবে।